NU Student ProOpen app →

Government and Politics in South Asia · দক্ষিণ এশিয়ার সরকার ও রাজনীতি · 211905

১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক অগ্রগতি সম্পর্কে লিখ।

broad · 10 marks Board 2015
১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক অগ্রগতি সম্পর্কে আলোচনা কর।

অথবা, ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক অগ্রগতি সম্পর্কে লিখ।

Answer

ভূমিকা:
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট প্রায় দুইশত বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির মধ্য দিয়ে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে ধর্মীয় ভাবাবেগ ও ধর্মীয় ঐক্যের ওপর ভিত্তি করে পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব বাংলার সমন্বয়ে এই নতুন রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল। নবগঠিত পাকিস্তানের প্রথম দশক (১৯৪৭-১৯৫৮) রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক দিক থেকে অত্যন্ত দুর্বল ছিল, যার ফলে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সুদৃঢ় হতে পারেনি। বস্তুত, ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের সাংবিধানিক অগ্রগতির ইতিহাস ছিল একটি সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান প্রণয়নের নিরন্তর প্রচেষ্টা ও সংগ্রামের ইতিহাস।

১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক অগ্রগতি:
১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক অগ্রগতিসমূহ নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. প্রথম গণপরিষদ:
১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইন অনুসারে পাকিস্তানের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে একই বছর একটি গণপরিষদ গঠন করা হয়। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি 'প্রথম গণপরিষদ' নামে পরিচিত। এই নবগঠিত গণপরিষদের প্রধান কাজ ছিল দেশের জন্য একটি সংবিধান রচনা করা এবং পূর্ণাঙ্গ সংবিধান রচিত না হওয়া পর্যন্ত এটি কেন্দ্রীয় আইনসভা হিসেবে কাজ করা। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে শ্রী যোগেন্দ্র নাথ মণ্ডলের সভাপতিত্বে গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সর্বসম্মতিক্রমে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে গণপরিষদের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।

২. আদর্শ প্রস্তাব (Objectives Resolution):
পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদ ১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে দেশের ভবিষ্যৎ সংবিধানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব গ্রহণ করে। এই প্রস্তাবে বলা হয় যে, পাকিস্তান একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় ইসলামিক রাষ্ট্র হবে এবং এর শাসনভার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে থাকবে। সংবিধান প্রণয়নের ভিত্তি হিসেবে এই নীতি নির্ধারণী প্রস্তাবগুলো প্রথম গণপরিষদে পাস ও অনুমোদিত হয়। এই প্রস্তাবগুলো সম্মিলিতভাবে 'আদর্শ প্রস্তাব' নামে পরিচিত, যা পাকিস্তানের সংবিধানের মূল দর্শন নির্ধারণ করে।

৩. মূলনীতি কমিটির রিপোর্ট (Report of the Basic Principles Committee):
পাকিস্তানের সংবিধান রচনার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল 'মৌলনীতি কমিটি' গঠন। ১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খাঁন এবং মৌলবি তমিজউদ্দিন খানের নেতৃত্বে এই কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটি ১৯৪৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর একটি অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট গণপরিষদে পেশ করে। রিপোর্টে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন, কেন্দ্রে দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা এবং রাষ্ট্রভাষা হিসেবে একমাত্র উর্দুকে গ্রহণ করার প্রস্তাব করা হয়। সংবিধান প্রণয়নের কাজকে ত্বরান্বিত করার জন্য চারটি সাব-কমিটি গঠন করা হয়, যথা: (ক) যুক্তরাষ্ট্রীয় ও প্রাদেশিক সরকার সম্বন্ধীয় সাব-কমিটি; (খ) নির্বাচন সংক্রান্ত সাব-কমিটি; (গ) বিচারবিভাগ সংক্রান্ত সাব-কমিটি এবং (ঘ) মৌলিক অধিকারবিষয়ক সাব-কমিটি।

৪. উলেমা বোর্ড:
মূলনীতি কমিটির পাশাপাশি ধর্মীয় পণ্ডিতদের সমন্বয়ে একটি বোর্ড গঠনের প্রস্তাব করা হয়, যা 'উলেমা বোর্ড' নামে পরিচিত। এই বোর্ডের প্রধান কাজ ছিল সংবিধানের বিভিন্ন ধারায় সাব-কমিটিগুলোকে ধর্মীয় বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করা, যাতে সংবিধান ইসলামী মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

৫. অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট (১৯৫০):
১৯৫০ সালের জুলাই মাসে মূলনীতি কমিটির যুক্তরাষ্ট্রীয় ও প্রাদেশিক সরকার সম্বন্ধীয় সাব-কমিটি তাদের আলোচনা সম্পন্ন করে। এরপর ১৯৫০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর একটি অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট গণপরিষদে পেশ করা হয়। এই রিপোর্টটি অনেকাংশে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের অনুরূপ ছিল এবং এতে সংবিধানের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে সুপারিশ পেশ করা হয়।

৬. নাজিমুদ্দিন রিপোর্ট:
পাকিস্তানের ভাবী সংবিধানের চূড়ান্ত কাঠামো রচনার উদ্দেশ্যে ১৯৫২ সালের ২২ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন মূলনীতি কমিটির দ্বিতীয় বা চূড়ান্ত রিপোর্ট গণপরিষদে পেশ করেন। এটি 'নাজিমুদ্দিন রিপোর্ট' নামে পরিচিত। এই রিপোর্টে কেন্দ্রীয় আইনসভা দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট হবে বলে প্রস্তাব করা হয় এবং পাকিস্তানের উভয় অংশের মধ্যে আইনসভায় আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে 'সমতার নীতি'র ওপর জোর দেওয়া হয়। উচ্চকক্ষের আসন সংখ্যা ১২০ এবং নিম্নকক্ষের আসন সংখ্যা ৪০০ স্থির করা হয়।

৭. মোহাম্মদ আলী ফর্মুলা:
১৯৫৩ সালের ১৭ এপ্রিল পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ নাজিমুদ্দিন মন্ত্রিসভা ভেঙে দেন এবং ওয়াশিংটনে নিযুক্ত তৎকালীন রাষ্ট্রদূত বগুড়ার মোহাম্মদ আলীকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। মোহাম্মদ আলী পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সংবিধানের স্বরূপ উপলব্ধি করে উভয় অংশে সংখ্যাসাম্য নীতির ওপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করে একটি নতুন ফর্মুলা প্রদান করেন। পাকিস্তানের সাংবিধানিক অগ্রগতির ইতিহাসে এটি 'মোহাম্মদ আলী ফর্মুলা' নামে পরিচিত, যা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার চেষ্টা করে।

৮. প্রথম গণপরিষদ বাতিল:
১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে মুসলিম লীগ যুক্তফ্রন্টের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১৯৫৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন সংশোধন করে মন্ত্রিপরিষদ ও আইনসভার ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গভর্নর জেনারেলের ক্ষমতা সীমিত করা হয়। এতে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ক্ষিপ্ত হয়ে ১৯৫৪ সালের ২৪ অক্টোবর প্রথম গণপরিষদ বাতিল ঘোষণা করেন, যা সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে এক বড় ধাক্কা দেয়।

৯. দ্বিতীয় গণপরিষদ আদেশ জারি:
১৯৫৫ সালে 'দ্বিতীয় গণপরিষদ' আদেশ জারি করা হয়। মূলত, গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ কর্তৃক প্রথম গণপরিষদ বাতিলের ঘোষণাকে চ্যালেঞ্জ করে গণপরিষদের সভাপতি মৌলবি তমিজউদ্দিন খান আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালত এই ঘোষণাকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় প্রদান করে এবং একটি নতুন গণপরিষদ গঠনের পরামর্শ দেয়। এই পরামর্শ অনুযায়ী ৪০ জন সদস্য পূর্ব পাকিস্তান থেকে এবং ৪০ জন সদস্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নিয়ে দ্বিতীয় গণপরিষদের যাত্রা শুরু হয়।

১০. মারী চুক্তি:
দ্বিতীয় গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন ১৯৫৫ সালের ৭ জুলাই পশ্চিম পাকিস্তানের মারীতে অনুষ্ঠিত হয়। কয়েক দফা আলোচনার মধ্য দিয়ে সংবিধান প্রণয়ন সম্পর্কিত একটি আপস চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই চুক্তিটি 'মারী চুক্তি' নামে পরিচিত, যা সংবিধান রচনার পথে বিদ্যমান অচলাবস্থা নিরসনে সহায়ক হয়।

১১. সংবিধান প্রণয়ন:
দ্বিতীয় গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশন করাচিতে অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৫৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর (যদিও এটি ১৯৫৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তবে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী) পশ্চিম পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা বিলটি গণপরিষদে গৃহীত হয়, যার মাধ্যমে 'এক ইউনিট' ব্যবস্থা প্রবর্তনের পথ সুগম হয়। এরপর ১৯৫৬ সালের ৯ জানুয়ারি অতি অল্প সময়ের মধ্যে একটি খসড়া বিল গণপরিষদে পেশ হয়। ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি এই খসড়া বিলটি গণপরিষদে চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয় এবং ১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান তার প্রথম সংবিধান কার্যকর করে।

১২. ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন:
১৯৫৬ সালের সংবিধান কার্যকর হওয়ার মাত্র আড়াই বছরের মাথায়, ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করেন। তিনি তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত করেন। এই সময়ে ১৯৫৬ সালের সংবিধানকে বাতিল করা হয় এবং পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারগুলোও বাতিল করা হয়, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণভাবে রুদ্ধ করে দেয়। তবে ২৭ অক্টোবর (১৯৫৮) আইয়ুব খান নিজেই প্রেসিডেন্ট হন এবং ইস্কান্দার মির্জাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন, যার মাধ্যমে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায় যে, পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রথম দশক অর্থাৎ ১৯৪৭-১৯৫৮ সাল পর্যন্ত সাংবিধানিক অগ্রগতির পথ ছিল অত্যন্ত বন্ধুর ও জটিল। এই সময়ে একটি সংবিধান প্রণয়নের জন্য বহু প্রচেষ্টা চালানো হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং আঞ্চলিক বৈষম্য এর বাস্তবায়নকে বিলম্বিত করে। যদিও ১৯৫৬ সালে একটি সংবিধান প্রণীত হয়েছিল, তা মাত্র আড়াই বছর টিকে ছিল। এই প্রথম দশকের শাসনতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল গণতন্ত্রের পরিপন্থী, যা পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করে এবং ১৯৭১ সাল পর্যন্ত দেশটির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।