NU Student ProOpen app →

Government and Politics in South Asia · দক্ষিণ এশিয়ার সরকার ও রাজনীতি · 211905

শ্রীলঙ্কার সংসদীয় পদ্ধতির কার্যক্রম পরীক্ষা কর।

broad · 10 marks Appeared 2× · 2019, 2015
শ্রীলঙ্কার সংসদীয়

পদ্ধতির কার্যক্রম

পরীক্ষা কর।

Answer

ভূমিকা:

শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ এশিয়ার একটি দ্বীপরাষ্ট্র, ১৯৪৮ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর একটি সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে শ্রীলঙ্কার সংসদীয় পদ্ধতির কার্যক্রম ব্রিটিশ এবং ভারতীয় মডেল দ্বারা বহুলাংশে প্রভাবিত ছিল। তবে, জাতিগত সংঘাত, বিশেষ করে সিংহলী ও তামিল জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ, দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সংসদীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতাকে বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এই জাতিগত বিভেদ শ্রীলঙ্কার সম্ভাবনাময় অর্থনীতি ও সামাজিক অগ্রগতির পথে এক বড় বাধা হিসেবে কাজ করেছে। এই উত্তরের মাধ্যমে আমরা শ্রীলঙ্কার সংসদীয় পদ্ধতির সূচনা, বিবর্তন এবং ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত এর কার্যক্রম বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করব।

১. সংসদীয় পদ্ধতির সূচনা ও প্রাথমিক কাঠামো (১৯৪৮-১৯৭০):
স্বাধীনতা লাভের পর শ্রীলঙ্কা (তৎকালীন সিলোন) ব্রিটিশ ধাঁচের একটি সংসদীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এই ব্যবস্থায় পার্লামেন্ট একটি দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা দ্বারা গঠিত ছিল। নামে মাত্র একজন রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন, যিনি গভর্নর-জেনারেল হিসেবে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করতেন এবং ব্রিটেনের রাজা কর্তৃক নিযুক্ত হতেন। তাঁর ক্ষমতা ছিল সীমিত ও আনুষ্ঠানিক।

  • নিম্নকক্ষ:
    প্রতিনিধিসভা (House of Representatives) ছিল জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত। এর সদস্য সংখ্যা ছিল ১০১ জন। এর মধ্যে ৯৫ জন সদস্য ২১ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী নাগরিকদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হতেন এবং অবশিষ্ট ৬ জন গভর্নর-জেনারেল কর্তৃক মনোনীত হতেন।

উচ্চকক্ষ:
সিনেট (Senate) ছিল আংশিকভাবে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত ও মনোনীত। এর সদস্য সংখ্যা ছিল ৩০ জন, যার অর্ধেক গভর্নর-জেনারেল এবং বাকি অর্ধেক প্রতিনিধিসভা কর্তৃক নির্বাচিত হতেন। সিনেটের মেয়াদকাল ছিল ছয় বছর। সিনেটকে প্রতিনিধিসভার অধীনস্থ করা হয়েছিল এবং এর প্রধান কাজ ছিল নিম্নকক্ষের সিদ্ধান্তগুলো পর্যালোচনা ও নিয়ন্ত্রণ করা। এই কাঠামো ১৯৭০ সাল পর্যন্ত কার্যকর ছিল।

২. প্রজাতান্ত্রিক সংবিধান ও সংসদীয় ব্যবস্থার বিবর্তন (১৯৭০-১৯৭৭):
১৯৭০ সালে ‘ইউনাইটেড ফ্রন্ট’ নামক একটি কোয়ালিশন সরকার শ্রীলঙ্কার ক্ষমতায় আসে। এই সরকার দেশটির সংসদীয় ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। ১৯৭১ সালের মে মাসে শ্রীমতি শ্রীমাভো বন্দরনায়কে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৭২ সালের ২২শে মে সিলোনকে একটি প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং এর নাম পরিবর্তন করে ‘শ্রীলঙ্কা’ রাখা হয়। একই সাথে একটি নতুন প্রজাতান্ত্রিক সংবিধান গৃহীত হয়। শ্রীলঙ্কা কমনওয়েলথের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবেই থাকে।

এই নতুন সংবিধানে গভর্নর-জেনারেলের পদ বিলুপ্ত করে প্রেসিডেন্টের পদ সৃষ্টি করা হয়। তবে, এই প্রেসিডেন্টও ছিলেন নামে মাত্র রাষ্ট্রপ্রধান। প্রকৃত শাসন ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিপরিষদের হাতেই ন্যস্ত ছিল। পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতো এবং তাঁর মন্ত্রিপরিষদ পার্লামেন্টের কাছে দায়বদ্ধ থাকত। এই ব্যবস্থা গ্রেট ব্রিটেন বা ভারতের সংসদীয় ব্যবস্থার অনুরূপ ছিল, যেখানে প্রধানমন্ত্রীই ছিলেন সরকারপ্রধান এবং প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী।

৩. সংসদীয় ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন ও রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি (১৯৪৮-১৯৭৭):
শ্রীলঙ্কার সংসদীয় ব্যবস্থা ১৯৪৮ সালে শুরু হয়ে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত কার্যকর ছিল। এই সময়ে বেশ কয়েকটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা দেশটির গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। উল্লেখযোগ্য নির্বাচনগুলো হলো ১৯৫২, ১৯৫৬, ১৯৬০, ১৯৬৫, ১৯৭০ এবং ১৯৭৭ সালের নির্বাচন।

১৯৫২ সালের নির্বাচনে প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডি.এস. সেনানায়কের আকস্মিক মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ডাডলি সেনানায়ক ক্ষমতায় আসেন। এই নির্বাচনে এস.ডব্লিউ.আর.ডি. বন্দরনায়কের নেতৃত্বে শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টি (SLFP) অংশগ্রহণ করে এবং তিনি বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন, যা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯৫৬ সালের নির্বাচন শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এই নির্বাচনে ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (UNP) পরাজিত হয় এবং গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মেনে নির্বাচনের ফলাফল গ্রহণ করে। বিরোধী দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ‘মহাজন একসথ পেরামুনা’ (MEP) জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে এবং সলোমন বন্দরনায়কে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সুদৃঢ় হয় এবং একদলীয় ব্যবস্থার প্রবণতা হ্রাস পায়। এই নির্বাচনের পর ভোটারের বয়সসীমা ২১ বছর থেকে কমিয়ে ১৮ বছর করা হয়, যা গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করে।

১৯৬০ সালের নির্বাচনকালে বহু নতুন রাজনৈতিক দলের উদ্ভব হয়। একই বছর অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় নির্বাচনে শ্রীমাভো বন্দরনায়কে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলেও সিনেটের সদস্য মনোনীত হয়ে দলনেত্রী নির্বাচিত হন এবং বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার গঠন করেন। ১৯৬৫ সালের নির্বাচনে ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (UNP) জয়ী হয়ে কোয়ালিশন সরকার গঠন করে।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টি (SLFP) ক্ষমতায় আসে এবং ‘ইউনাইটেড ফ্রন্ট’ কোয়ালিশন সরকার পরিচালনা করে। ১৯৭১ সালের মে মাসে শ্রীমতি বন্দরনায়কে পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হন। এই সময়ে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় ছিল এবং সরকার কর্তৃক গৃহীত সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচিগুলো কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়।

১৯৭৭ সালের সাধারণ নির্বাচন শ্রীলঙ্কার সংসদীয় ব্যবস্থার শেষ অধ্যায় ছিল। এই নির্বাচনে জুলিয়াস জয়বর্ধন (UNP) এবং শ্রীমাভো বন্দরনায়কে (SLFP) প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হন। নির্বাচনে ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (UNP) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং ৭১ বছর বয়সী জুলিয়াস জয়বর্ধন প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। এই নির্বাচনের পর শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে, যা সংসদীয় পদ্ধতি থেকে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হয়।

উপসংহার:

শ্রীলঙ্কার সংসদীয় পদ্ধতি ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত কার্যকর ছিল। এই ব্যবস্থায় একজন নামে মাত্র রাষ্ট্রপ্রধান (গভর্নর-জেনারেল বা প্রেসিডেন্ট) থাকলেও প্রকৃত ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিপরিষদের হাতেই কেন্দ্রীভূত ছিল। এই সময়ে শ্রীলঙ্কা নিয়মিত নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বজায় রেখেছিল এবং ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরও পরিলক্ষিত হয়েছে। তবে, জাতিগত সংঘাত, অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা সংসদীয় ব্যবস্থার সুষ্ঠু কার্যকারিতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল। ১৯৭৭ সালের পর শ্রীলঙ্কা একটি নতুন সাংবিধানিক পথে যাত্রা শুরু করে, যা সংসদীয় পদ্ধতির সমাপ্তি ঘটায় এবং রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হয়।