Government and Politics in South Asia · দক্ষিণ এশিয়ার সরকার ও রাজনীতি · 211905
জাতীয় নেতা হিসেবে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা আলোচনা কর এবং ক্ষমতার উৎস সম্পর্কে বর্ণনা কর। অথবা, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যাবলি, পদমর্যাদা এবং ক্ষমতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা কর। অথবা, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও কার্যাবলি আলোচনা কর।
অথবা, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যাবলি, পদমর্যাদা এবং ক্ষমতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা কর।
অথবা, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও কার্যাবলি আলোচনা কর।
Answer
ভূমিকা:
ভারতীয় শাসনব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী সরকার প্রধান হিসেবে এক অনন্য ও অসাধারণ পদমর্যাদার অধিকারী। সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী র্যামসে মুইর (Ramsay Muir) যথার্থই বলেছেন, “প্রধানমন্ত্রী হলেন রাষ্ট্ররূপ জাহাজের চালিকাশক্তি” (“Prime minister is the steering wheel of the ship of the state.”)। বস্তুত, প্রধানমন্ত্রীর সাফল্য ও দক্ষতার ওপরই গোটা মন্ত্রিসভা তথা সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার সাফল্য বহুলাংশে নির্ভরশীল। ভারত একটি সংসদীয় বা মন্ত্রিপরিষদ শাসিত শাসনব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, যা ভারতবাসীর দীর্ঘদিনের আশা-আকাঙ্ক্ষার ফলস্বরূপ। এই শাসনব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী প্রভৃত প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার অধিকারী। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কোনো সাংবিধানিক ধারায় সুনির্দিষ্টভাবে উল্লিখিত না হলেও, ভারতীয় সংবিধান প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি সম্পর্কে বিশেষভাবে আলোকপাত করেছে, যা তাঁর জাতীয় নেতার ভূমিকাকে আরও সুদৃঢ় করে।
প্রধানমন্ত্রীর সময়কাল ও নিয়োগ:
ভারতের রাষ্ট্রপতি সাধারণত লোকসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বা নেত্রীকেই সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানান এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করেন। এর কারণ হলো, প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিসভাকে যৌথভাবে লোকসভার কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হয়। তবে, যদি কোনো দল লোকসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারে, সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের বিষয়ে রাষ্ট্রপতি তাঁর নিজস্ব বিচারবুদ্ধি ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করতে পারেন। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, ভারতের রাষ্ট্রপতি পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বা নেত্রীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যাবলি ও ক্ষমতা:
সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী হলেন মন্ত্রিসভার প্রধান এবং সর্বোচ্চ কর্তৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি। তাঁর কার্যাবলি ও ক্ষমতা বিস্তৃত এবং বহুমুখী। নিচে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা: প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন, চুক্তি ও আলোচনার ক্ষেত্রে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। কমনওয়েলথসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তিনি ভারতের মুখপত্র হিসেবে কাজ করেন। এছাড়াও, বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের তিনি ভারতবাসীর পক্ষ থেকে স্বাগত জানান এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। ভারতের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ধারক।
২. অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ: দেশের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তার বাস্তবায়নের কার্যাবলি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণেও প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তিনি পরিকল্পনা কমিশন (বর্তমানে নীতি আয়োগ) এবং জাতীয় উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি হিসেবে কাজ করেন, যা তাঁকে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করে।
৩. নিয়োগ বিষয়ক ক্ষমতা: বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কার্যত রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ মেনেই চলেন। ভারতের অ্যাটর্নি জেনারেল, সর্বোচ্চ ব্যয় নিয়ন্ত্রক ও মহাহিসাব পরীক্ষক, নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় কমিশন, আন্তঃরাজ্য পরিষদ, অনুন্নত শ্রেণিগুলোর অবস্থা বিষয়ে অনুসন্ধান কমিশন প্রভৃতির সদস্যদের নিয়োগের সময় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অপরিহার্য। এমনকি বিভিন্ন রাজ্যের রাজ্যপাল এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রী বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।
৪. প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত: দেশের প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণে প্রধানমন্ত্রী সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বিদেশের সাথে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানি করা হবে কিনা, সে বিষয়ে তিনিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তাঁর সিদ্ধান্তই শেষ কথা।
৫. জাতীয় সংকট মোকাবিলায় ভূমিকা: প্রধানমন্ত্রী দেশের জাতীয় স্বার্থ এবং সুষ্ঠু রাজনৈতিক ব্যবস্থা বজায় রাখার জন্য জাতীয় সংকট মোকাবিলায় গঠনমূলক আলোচনায় নেতৃত্ব দেন। প্রয়োজনে তিনি বিরোধীদলীয় নেতার সাথে বৈঠকে মিলিত হয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন, যা জাতীয় ঐক্যের প্রতীক।
৬. লোকসভার নেতা বা নেত্রী হিসেবে: প্রধানমন্ত্রী সরকারের প্রধান মুখপাত্র হিসেবে লোকসভায় সরকারি নীতিসমূহ ব্যাখ্যা করেন। সভায় বিতর্ক চলাকালীন কোনো মন্ত্রী অসুবিধার সম্মুখীন হলে তাঁকে সাহায্য করার জন্য প্রধানমন্ত্রীকেই এগিয়ে আসতে হয়। গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো বিল পাস করানোর দায়িত্ব তাঁকেই বহন করতে হয়। বিরোধী দলগুলোর সাথে যথাসম্ভব সুসম্পর্ক বজায় রেখে সভার কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদিত হয়, সে বিষয়ে তাঁকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হয়। লোকসভার অধিবেশন কখন আহূত হবে, কতদিন চলবে, কোন কোন বিষয়ের উপর আলোচনা চলবে ইত্যাদি বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী।
৭. সংখ্যাগরিষ্ঠ দলীয় নেতা: লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বা নেত্রী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে পার্লামেন্টের ভিতরে ও বাইরে সর্বদা দলীয় মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে হয়। দলের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা দিলে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তিনি সেসব বিরোধের নিষ্পত্তি করে দলীয় ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখেন। সরকারি দলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি, নির্বাচনে দলীয় সাফল্য, জনমতের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা ইত্যাদি কার্যাবলি সম্পাদনের দায়িত্ব মূলত তাঁরই।
৮. মন্ত্রিসভা গঠনে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা: প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ লাভের পর তাঁর সর্বপ্রথম কাজ হলো সরকার বা মন্ত্রিসভার গঠন সম্পন্ন করা। প্রকৃত বিচারে প্রধানমন্ত্রী তাঁর দলের মধ্য থেকে নেতৃস্থানীয় ও যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের বিভিন্ন দফতরের জন্য মন্ত্রী হিসেবে বাছাই করে একটি তালিকা প্রস্তুত করেন। রাষ্ট্রপতি উক্ত তালিকা মোতাবেক মন্ত্রীদের নিয়োগ দান করেন। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর অভিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতার প্রকাশ ঘটে। মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা হ্রাস-বৃদ্ধি প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল।
৯. প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভা: প্রধানমন্ত্রী কেবিনেটের সভায় সভাপতিত্ব করেন এবং এর আলোচ্যসূচি স্থির করেন। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন ছাড়া কোনো বিষয় কেবিনেটের আলোচনার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি নির্ধারণে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগীরূপে কেবিনেট কাজ করে। কোন কোন মন্ত্রীকে নিয়ে কেবিনেট গঠিত হবে এবং কেবিনেট মন্ত্রীর সংখ্যা কত হবে, প্রধানমন্ত্রীই তা নির্ধারণ করেন।
১০. রাষ্ট্রপতির পরামর্শদাতা: রাষ্ট্রপতি কেন্দ্রীয় সরকারের যেকোনো প্রশাসনিক বিষয় সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং আইন প্রণয়নের যেকোনো প্রস্তাব সম্পর্কে তথ্য জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীকে তা অবহিত করা তাঁর সাংবিধানিক কর্তব্য। রাষ্ট্রপতির সাথে মন্ত্রিসভার যোগসূত্র রক্ষার দায়িত্বও প্রধানমন্ত্রীর।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার উৎস:
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী গণতান্ত্রিক নির্বাচন পদ্ধতির মাধ্যমে জনগণের রায়ে নির্বাচিত হন এবং বিশাল ক্ষমতার অধিকারী হন। নিম্নে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার প্রধান উৎসগুলো আলোচনা করা হলো:
১. মন্ত্রিপরিষদের ক্ষমতা: প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিপরিষদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা ও পরামর্শ লাভ করেন, যা তাঁকে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের সহযোগিতা ও পরামর্শ গ্রহণ ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার একটি অন্যতম উৎস।
২. প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিত্ব ও পদমর্যাদা: ভারতের প্রধানমন্ত্রী প্রায়শই অত্যন্ত দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন হন। তাঁর কর্মদক্ষতা, ব্যক্তিত্ব এবং উচ্চ পদমর্যাদা তাঁর ক্ষমতার অন্যতম উৎস। তিনি যেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তার বিরুদ্ধে সাধারণত কেউ কথা বলার মতো থাকে না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের মর্যাদাবান ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে একজন হিসেবে বিবেচিত হন।
৩. জনমত: জনগণ যে দলকে বেশি ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে, সেই দলই সরকার গঠন করে এবং সেই দল থেকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার প্রধান উৎস হলো জনগণের মতামত বা রায়। ভারতে জনমতই হলো ক্ষমতার প্রবলতম উৎস, কেননা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জনগণের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ রায়ে নির্বাচিত হন।
৪. সংবিধান: ভারতীয় সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও কার্যাবলি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সাংবিধানিক ক্ষমতাবলেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, যার কারণে তাঁর সিদ্ধান্ত সহসাই পরিবর্তন করা সম্ভব হয় না। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী সাংবিধানিকভাবে নির্বাচিত হন বিধায় সংবিধান তাঁর ক্ষমতার একটি মৌলিক উৎস।
৫. দলীয় ক্ষমতা: প্রধানমন্ত্রী দলের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। দলের কর্মীদের পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী অনেক কার্যক্রম সম্পাদন করেন। দলীয় ক্ষমতা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার একটি অন্যতম উৎস, কারণ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন দলীয়ভাবে। সংসদে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে, সেই দল থেকেই প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।
উপসংহার:
উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, জনগণের আস্থার উপর ভিত্তি করে প্রধানমন্ত্রী দেশের ভাবমূর্তি বিশ্বের সামনে তুলে ধরেন এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই নেতৃত্ব প্রদান করেন। ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী বিশেষ 'ক্ষমতার মূর্তপ্রতীক' হিসেবে সাংবিধানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলি সম্পাদন করেন। অধ্যাপক জেনিংস (Prof. Jennings) যথার্থই বলেছেন, “প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা নির্ধারণে ব্যক্তিত্ব নিঃসন্দেহে এক বিরাট ভূমিকা পালন করে।” (“Personality undoubtedly plays a great part in determining the power of a Prime Minister.”)। সুতরাং, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা, কার্যাবলি, পদমর্যাদা এবং ক্ষমতার উৎসগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তিনি কেবল সরকার প্রধানই নন, একজন শক্তিশালী জাতীয় নেতাও বটে।