BANGLA SHORT STORY-1 · 231005
বউ গেলে বউ পাইবো, কিন্তু আমার ভাই "ফাঁসি গেলে আর তো ভাই পাইবো না" -কে, কেন একথা বলেছে?
-কে, কেন একথা বলেছে?
Answer
প্রশ্নোক্ত উক্তিটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'শাস্তি' গল্পের প্রধান চরিত্র ছিদাম রুইয়ের। পারিবারিক কলহ, দারিদ্র্য এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের জটিল মনস্তত্ত্বের প্রেক্ষাপটে এই উক্তিটি গল্পের এক মর্মান্তিক মুহূর্তে উচ্চারিত হয়েছে, যা ছিদামের মানসিকতা ও তৎকালীন সামাজিক মূল্যবোধের পরিচয় বহন করে।
ছিদাম রুই তার বড় ভাই দুখিরাম রুইয়ের সাথে একান্নবর্তী পরিবারে বসবাস করত। তারা উভয়েই দরিদ্র কৃষক এবং হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করত। তাদের সংসারে ছিল দুখিরামের দেড় বছরের পুত্রসন্তান এবং দুই ভাইয়ের স্ত্রী। কিন্তু এই দুই বউয়ের মধ্যে নিত্যদিন ঝগড়া-বিবাদ লেগেই থাকত, যা প্রতিবেশীদের কাছেও ছিল এক স্বাভাবিক ঘটনা। একদিন সন্ধ্যায় জমিদার কাছারি থেকে ক্ষুধার্ত দুখিরাম বাড়ি ফিরে তার বড় বউয়ের (চন্দরা) কাছে ভাত চায়। চন্দরা তখন রাগান্বিত হয়ে বলে, "ভাত কোথায় যে ভাত দিব, তুই কি চাল দিয়া গিয়াছিলি? আমি কি নিজে রোজগার করে আনবো?" এই অপমানজনক কথা শুনে ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত দুখিরামের মনে তীব্র আঘাত লাগে। ক্রোধের বশে সে দা দিয়ে তার বউ চন্দরার মাথায় কোপ মারে এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
এই ঘটনার পর রামলোচন খুড়ো তাদের বাড়িতে আসেন। ভাইকে বাঁচানোর জন্য ছিদাম তৎক্ষণাৎ তার নিজের স্ত্রী চন্দরার নাম বলে দেয় এবং তাকে বাঁচানোর কোনো চেষ্টাও করে না। রামলোচন বাবু ছিদামকে পরামর্শ দেন যে, সে যেন পুলিশ বা অন্যদের কাছে তার ভাইয়ের (দুখিরামের) দোষ দেয়, তাহলে তার (ছিদামের) বউ ফাঁসির হাত থেকে বেঁচে যাবে। এই পরিস্থিতিতেই ভাইয়ের প্রতি অকৃত্রিম মমত্ববোধ এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মূল্যবোধের কারণে ছিদাম প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করে— "বউ গেলে বউ পাইবো, কিন্তু আমার ভাই ফাঁসি গেলে আর তো ভাই পাইবো না।" তার কাছে স্ত্রীর চেয়ে ভাইয়ের জীবন ছিল অধিক মূল্যবান ও অপরিহার্য।
ছিদামের এই উক্তির মধ্য দিয়ে তৎকালীন বাঙালি সমাজের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের গভীর মমত্ববোধের এক বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। তার কাছে স্ত্রীর স্থান ছিল গৌণ, কিন্তু ভাইয়ের সম্পর্ক ছিল চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয়।