NU Student ProOpen app →

BANGLA SHORT STORY-1 · 231005

পথের পাঁচালী উপন্যাসের শিল্পমূল্য বিচার করো।

broad · 10 marks Appeared 3× · 2023, 2020, 2015
'পথের পাঁচালী' উপন্যাসের বিষয় স্বাতন্ত্র্য ও শিল্পবৈশিষ্ট্যের পরিচয় দাও।

অথবা, 'পথের পাঁচালী' উপন্যাসের শিল্পমূল্য বিচার করো।

Answer

ভমিকা: প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক বিভূতিভষণ এক স্বতন্ত্র্য শিল্পী। তাঁর মতো এমন স্বভাবে বাংলা ভাষায় আর কোনো লেখকই সাহিত্য সৃষ্টি করেননি। প্রকৃতির অফুরন্ত বর্ণনা, অপার রহস্যময় বিস্ময় বোধ, আর মুগ্ধতার পূর্ব সুষমামণ্ডিত বিবরণ, এক মহাজাগতিক চেতনার উপলব্ধি উচ্ছ্বসিত হয়েছে তাঁর সাহিত্যে। বিভূতিভূষণের প্রথম উপন্যাস 'পথের পাঁচালী' (১৯২৯)। এই উপন্যাসের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে তাঁর আসন পাকা করে নিয়েছেন।

বিষয় স্বাতন্ত্র্য ও শিল্পীবৈশিষ্ট্যর পরিচয় বা শিল্পমূল্য বিচার: প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর বাংলা সাহিত্যে জীবনের অবক্ষয় আর সংশয়

জিজ্ঞাসার পটভূমিতে বিভূতিভূষণের 'পথের পাঁচালী' উপন্যাস সম্পূর্ণ এক নতুন জগতের সৃষ্টি করে। উপনিবেশ ভারতের দারিদ্র্যের ছবি 'পথের পাঁচালী'তে অত্যন্ত জীবনঘনিষ্ঠ হিসেবে চিত্রিত হয়েছে। নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের দরিদ্র ব্রাক্ষণ হরিহরের সংসার- কী সব তুচ্ছ খাদ্যের বর্ণনা, কী সব আকুল করা অতি তুচ্ছ বাসনার বিবরণ, অন্ধকার হতাশা নিশ্চুপ ঘরের মধ্যে কুলীন ঘরের বিধবা ইন্দির ঠাকুন একমুঠো চালভাজা নিয়ে বসেছে, একটি দু'টি নোনা আতা, একটা জীর্ণ কলা। তার মুখের দিকে লোভের দৃষ্টি মেলে দুর্গার একাগ্র চেয়ে থাকা, সর্বজয়ার ঠোঁট চাপা দারিদ্র্য, লাঞ্ছিত, নিষ্ঠুরতা এমন যে মহাজগৎ মহাজীবনকে ধরতে চেয়ে উপনিবেশ ভারতবর্ষের গ্রামীণ জীবনের অসাধারণ চিত্র অঙ্কিত হয়েছে, যা তৎকালীন সাহিত্যে বিরল ব্যাপার ছিল, তৎকালীন সাহিত্যিকগণ যখন দিনবদলের হাওয়ায় দোদুল্যমান, সাহিত্যের আকাশ যখন নতুনের আগমনের প্রতিজ্ঞায় অপেক্ষমান, সে সময় বিভূতিভূষণ সম্পূর্ণ আলাদা আঙ্গিকে তাঁর 'পথের পাঁচালী' নিয়ে পদার্পণ করেন।

বিভূতিভূষণের 'পথের পাঁচালী' উপন্যাসের বিষয় ছিল তৎকালীন সমাজের সাহিত্যজগৎ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, বিক্ষুদ্ধ জনজীবনের কর্মকোলাহল তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। নতুন সমাজচেতনা, বিচিত্র বাস্তব জীবন সমস্যাকে উপেক্ষা করে তিনি পল্লি * গ্রামের সাধারণ মানুষের চলমান জীবনকে সাহিত্যের বিষয় হিসেবে নির্বাচন করেন। তাঁর সাহিত্যের মাধ্যমে পাঠক সমাজ নতুন করে স্বস্তির আশ্বাস পায়।
বিভূতিভূষণের সাহিত্যে নতুন সমাজ চেতনার বদলে পল্লি গ্রামের সাধারণ মানুষের অতি ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতর বিষয় স্থান পায়।

তিনি পল্লি গ্রামের সামগ্রিক অনুষঙ্গকে সাহিত্যের কেন্দ্রবিন্দ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর সাহিত্যের বিষয় হয়েছে বিটিশ শাসনের শাসকগোষ্ঠীর নীলকুঠির কাহিনি, রাজা বল্লাল সেনের প্রচলিত কৌলীন্য প্রথা। সময় ডাকাতি, লুটতরাজের চিত্র, জমিদার ও অবস্থাসম্পূর্ণ গৃহস্থদের মাসিক বেতনে পালিত ঠ্যাঙাড়াদের অত্যাচার, ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর নীলকুঠির কাহিনি, রাজা বল্লাল সেনের প্রচলিত কৌলীন্য প্রথা।

শিল্পীর 'পথের পাঁচালী' উপন্যাসে সমকালীন হিন্দু সমাজের বিভিন্ন কুসংস্কারের বিশ্বাসের চিত্র উচ্ছাসিত হয়েছে। যেমন-হরিহরের সন্তান না বাঁচাটাকে ব্রাহ্মভিশাপ বলে আখ্যায়িত করা, সুদর্শন পোকাকে ঠাকুরজ্ঞান করা, মাদুলির গুণেই হরিহর দীর্ঘায়ু পেয়েছে। যা অন্য যেকোনো সাহিত্যিকের সাহিত্যের বিষয়বস্তু হতে তাঁকে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে।

গ্রাম্য মানুষের সহজ সরল জীবনযাপন, হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ সম্বলিত জীবন সাহিত্যের বিষয় হতে পারে তা সর্বপ্রথম তাঁর জনার মধ্য দিয়ে পাঠক সমাজ উপলব্ধি করতে পারে। শহরে বসবাসরত ধনীদের আভিজাত্যের কারণে গ্রামের মানুষদেরকে তারা মানুষ বলেই গণ্য করে না। গ্রামের সহজ-সরল মানুষ শহুরে মানুষকে আপন করে নেয়, কিন্তু শহুরে মানুষ সর্বদা তাদের অবজ্ঞা করে, গ্রাম্য মানুষগুলোর মৌল অপরাধ তাদের দারিদ্য। সমস্ত দোষ দরিদ্রের ছেলেদের, ধনীর ছেলেরা ধোয়া তুলসী পাতা। কোনো দোষের আকর তাদের চরিত্রকে স্পর্শ করতে পারে না। বিত্ত বিভেদের সাথে সাথে মানুষে মানুষে সৃষ্টি বিষয়টি 'পথের পাঁচালী' উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে। শহুরে ভদ্রলোকেদের মধ্যে যারা মানুষরূপে পশু সে চিত্রও শিল্পী এ উপন্যাসে চিত্রিত করছেন। 'পথের পাঁচালী'তে নিয়ন্ত্রিত দুর্ভিক্ষ খুব ধীরে ধীরে বছরের পর বছর ধরে চলে এবং এক এক করে সে তার শিকারও বেছে নেয়। আর এই চিরায়ত কাহিনির মূল কারণ ছিল ক্ষুধা ও ক্ষুধাজনিত অপুষ্টি। প্রকৃতির এই করাল গ্রাস থেকে 'পথের পাঁচালী'র কোনো চরিত্র মুক্তি পায়নি। প্রধান চরিত্রগুলো কোনো না কোনোভাবে এই গ্রাসের শিকার হয়েছে। প্রকৃতির কোলে লালিত পালিত মানুষের ভেতরের এই নিগূঢ়তম দুঃখ বেদনাগুলো 'পথের পাঁচালী' উপন্যাসের স্বতন্ত্র্য বিষয় হিসেবে পরিলক্ষিত হয়।

তবে একথা অনিস্বীকার্য যে প্রকৃতির অবিসংবাদী প্রাধান্য একমাত্র 'পথের পাঁচালী'র 'আম আঁটির ভেঁপু' অংশে ছাড়া আর কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না এবং সেখানে প্রকৃতির গুরুত্ব যতখানি অপুর গুরুত্ব তার চেয়ে অনেকখানি বেশি। অবশ্য একথা সত্য যে প্রকৃতি বর্ণনায় ও প্রকৃতির রূপ-চিত্রণে বিভূতিভূষণের একটা নিজস্ব ধরনের নৈপুণ্য আছে যা অন্য সাহিত্যিকের রচনায় খুব সুলভনয় এবং নৈপুণ্য এমন এক অবর্ণনীয় মাধুর্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত যা সর্বপ্রকার বিশ্লেষণের অতীত। কিন্তু তাই বলে তাঁর সাহিত্যে প্রকৃতির একচ্ছত্র আধিপত্য কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না। হয় তাঁর প্রকৃতি অধ্যাত্মরসে পরিপুত, নয়তো তা মানবজীবনের প্রেক্ষাপট অথবা মানবমনের অন্তরঙ্গ অনুভূতির প্রকাশ মাধ্যম এবং বিভূতিভূষণের রচনায় এই দ্বিতীয় সম্পর্কের কথাই সবচেয়ে বেশি বলা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, বিভূতিভূষণকে প্রকৃতির কাব্যকার বললে হয়তো অন্যায় কিছু বলা হবে না, যদি আমরা সর্বদাই মনে রাখি যে প্রধানত তিনি মানুষের ইতিহাস রচয়িতা। মানুষের সুখ-দুঃখের পাঁচালীই তাঁর সাহিত্যের সর্বপ্রধান উপজীব্য। তাই তাঁর চরিত্র-চিত্রণ বৈশিষ্ট্যই আমাদের কাছে সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক বলে মনে হয়। বিভূতিভূষণের কেন্দ্রীয় নারী চরিত্রের মধ্যে কাউকেই কোনো অর্থে অসাধারণ বলে বর্ণনা চলে না। তারা বেশিরভাগ অতি সাধারণ নারী অশিক্ষিতা, অপ্রগলভা নারী চরিত্রগুলোর মধ্যে মাত্র দু'একটা ব্যতিক্রম আছে; যেমন 'পথের পাঁচালী'র অপরাজিত হরলীলা অথবা আরণ্যক এর ভানুমতী। তাছাড়া এরা সবাই আদর্শ নারী হৃদয় বলতে বিভূতিভূষণ নিজে যা বুঝতেন সেই বিশিষ্ট ধরনের নারী হৃদয়ের অধিকারিণী, অর্থাৎ এদের হৃদয়ে রোমান্টিক প্রেম কিংবা অতি মানবিক মহত্বের চেয়ে ঘরোয়া মায়া-মমতা ও প্রীতি স্নেহের স্থান অনেক বেশি উঁচুতে। বিভূতি সাহিত্যে নারীচরিত্রগুলো বরাবর যা ছিল চিরকাল তাই রয়ে যায়। চরিত্র হিসেবে এরা static, dynamic নয়। নারী চরিত্রগুলোর জীবনের মৌল বৈশিষ্ট্য Becomiong নয়, Being-কিন্তু বিভূতিভূষণের সৃষ্টি পুরুষ চরিত্রগুলোকে এই অর্থে কদাপি 'সাধারণ' বলা যায় না। অন্য কোনো গুণ না থাকলেও এরা সবাই অল্পাধিক পরিমাণে অসাধারণ। কেউ কেউ একটু ছিটগ্রস্থ বা বাউন্ডুলে খ্যাপাটে ধরনের লোক, কারো কারো মধ্যে অস্পষ্ট ঈষৎ বিভ্রান্ত আদর্শবাদের সন্ধ্যান মেলে, কোনো কোনো জন হয়তো উদাসীন, আপন ভোলা সত্যসন্ধ মানুষ যার মধ্যে আত্মসচেতনার চিহ্নমাত্র নেই, আবার কেউ কেউ বা এমন সরল স্বভাবের ভালো মানুষ যে তাকে বোকা বলাই বোধ হয় সংগত, কেউই ঠিক আর পাঁচজনের মতো নয়। এঁদের সমস্ত অসাধারণত্ব কিন্তু একমাত্র চরিত্রগত, বৈষয়িক সাফল্যের অথবা জীবনযাত্রার মানের দিক দিয়ে বিচার করলে এরা সবাই সাধারণ; নিম্নমধ্যবিত্ত বা দরিদ্র শ্রেণির লোক। বিভূতিভূষণের গল্পোপন্যাসের ধায় সব মানুষই সাধারণ গ্রামের মানুষ। তাঁর শিল্পর্মের সাথে কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থের শিল্পর্যের সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়, বিশেষভাবে মানবমনের সাথে প্রকৃতির সম্পর্ক বর্ণনায় তাঁদের শিল্পপন্থাও একজাতীয়। তবে সাদৃশ্য শুধু প্রকৃতির ক্ষেত্রে নয়, মানুষের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান। ওয়ার্ডসওয়াথের মতো তাঁর মানবদৃষ্টিও আংশিক; এক্ষেত্রে অন্তত সমদর্শী শিল্পী নয়। তাঁর চরিত্র চিত্রশালায় সাধারণ গ্রাম্য-মানুষ, দরিদ্র বা স্বল্পবিত্ত মানুষ, নিরীহ ধর্মভীরু সরলপ্রাণ মানুষের ভিড় বেশি। এই গ্রাম্য সরল মানুষগুলোকে শিল্পী খাঁটি মানুষ হিসেবে পরিগণিত করতেন। সুশিক্ষিত, সুসংস্কৃতি, বিত্তবান শহুরে মানুষের প্রতি তাঁর একটা স্বাভাবিক ঔদাসীন্য ছিল, একজন শিল্পী হিসেবে এটাকে ত্রুটি বলেই স্বীকার করতে হবে।
অনেকক্ষেত্রে বিভূতিভূষণের শিল্পীদৃষ্টি হয়তো খণ্ডিত ছিল, তবে তাঁর জীবন চেতনার মধ্যে এরকম কোনো অসম্পূর্ণতা ছিল না। তাঁর বিশ্বাস ছিল আধ্যাত্মিক জীবন, মানবজীবন ও ওঠে। শিল্পী ঈশ্বর, মানুষ ও প্রকৃতি এই ত্রিতত্ত্ব সমন্বিত চেতনাকেই তিনি পূর্ণাঙ্গ জীবন-চেতনা বলে মনে করতেন। সমগ্র জীবনধারার প্রকৃতিজীবন এই ত্রিবিধ জীবনের সমন্বয়েই জীবনের সমগ্রতা রূপরস সমৃদ্ধ হয়ে মধ্যে তিনি একটা সুষম সঙ্গতি ও ছন্দ আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন। তাই পল্লিজীবনের তুচ্ছ হাসিকান্নার কাহিনি থেকে বিশ্ব ইতিহাসের বিরাট পতন অভ্যুদয়ের কাহিনি পর্যন্ত, হাস্যকর গ্রাম্য কুসংস্কার থেকে ব্রহ্মোপলব্ধির তুরীয় অনুভূতি পর্যন্ত সব কিছুতেই অনায়াসে এই জীবনবৃত্তের অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পেরেছিলেন।

বিভূতিভূষণের সমকক্ষ অথবা তাঁর চেয়ে নিপুণতার কথাশিল্পী হয়তো বাংলা সাহিত্যে ভবিষ্যতে আরো আবির্ভূত হবেন, কিন্তু তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ পর্যায়ের রচনায় তিনি যে জাতীয় রস-সমৃদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন ঠিক সেই শ্রেণির রসসৃষ্টির আর কোনো সাহিত্যিক কখনো করেছেন বলে আমাদের জানা নেই এবং সুদূর ভবিষ্যতে করতে পারবেন এমন আশাও পোষণ করি না। গঠন পরিপাট্য, ঘটনাবিন্যাস কৌশল, রচনা-নৈপুণ্য, বর্ণনার বর্ণাঢ্যতা প্রভৃতি বহিরঙ্গ ঘটিত উৎকর্ষ তাঁর রচনায় যতখানি আছে অন্যান্য সাহিত্যিকের রচনায়ও ততখানি আছে, বেশি থাকাও অসম্ভব নয়। কিন্তু জীবন রূপসৃষ্টিতে এবং জীবন রস পরিবেশনে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। Craftsman হিসেবে, এমনকি বিশুদ্ধ Artist হিসেবেও তিনি যত বড়ো রসস্রষ্টা হিসেবে তার চেয়ে অনেক বেশি বড়ো রসের রাজ্যের অধিকর্তা হিসেবে তিনি অতুলনীয় অনন্য।
বিভূতিভূষণ রচনায় ভাষা সম্বন্ধে একটুও সচেতন ছিলেন না, বক্তব্য তাঁর মনকে সর্বদাই এমনভাবে আচ্ছন্ন করে রাখতো যে বক্তব্যের বাহন সম্বন্ধে চিন্তা করার অবকাশ বেশিভাগ সময়েই তাঁর থাকত না। তবে তাঁর অতিরিক্ত সমাচ্ছন্নতার ফল সবসময় শুভহয়নি। এর ফলে বিষয়বস্তু ও ভাষার মধ্যে মাঝে মাঝে পীড়াদায়ক অসঙ্গতির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বিভূতিভূষণের রচনায় যে ভাষাগত বৈচিত্র্য আমরা দেখতে পাই এবং তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনার ক্ষেত্রে যথাযথ সামঞ্জস্য উদ্ভুত যে পূর্ব রসানন্দের আস্বাদন পাই তা অন্যান্য সাহিত্যিকের রচনায় সত্যই দুর্লভ। 'আম-আঁটির ভেঁপু'র আবেশ বিহ্বল লিরিক সুর, 'আরণ্যক' এর প্রায় অধ্যাংশব্যাপী উদাত্ত গম্ভীর ধ্রুপদী নিঘোষ এবং 'অনুবর্তন' এর মতো উপন্যাসের এবং বড়ো ছোটো গল্পের বস্তুনিষ্ঠ ও নিরাতরণ আটপৌরে ভাষা। শিল্পীর পক্ষে সবই যেন সমানভাবে অনায়াস সাধ্য। বস্তুত তাঁর ভাষার মধ্যে আমরা Romanticism ও Realism-এর এমন একটা সমন্বয় দেখতে পাই যা কোনো দেশের সাহিত্যেই খুব একটা সুলভবস্তু নয়।

উপসংহার: সার্বিক বিচারে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, শিল্পী বিভূতিভূষণের 'পথের পাঁচালী' উপন্যাসের বিষয় যেমন স্বাতন্ত্র্য তেমনি তার শিল্পবৈশিষ্ট্যও অত্যন্ত নিপুণ। তিনি সকল যুগ ও কালের উর্ধ্বে। তিনি সম্পূর্ণরূপে নিসর্গ প্রেমিক সাহিত্যিক। কোনো যুগ বা সাহিত্যিকের সাথে তার রচনার সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্য তুলনাহীন। তিনি সকল যুগ, কাল ও সময়কে উপক্ষো করে নিজেকে সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে অধিষ্ঠিত করেছেন, সমকালীন সাহিত্য রচনায় তিনি তৎকালীন সকল সাহিত্যিককে পিছনে ফেলে নিজেকে শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকের স্থানে বসিয়ে নিজের আসন পাকা করে নিয়েছেন। তাঁর সাহিত্যের বিষয় যেমন স্বতন্ত্র্য, শিল্পী হিসেবে তাঁর পরিচয়ও অভিন্ন। তিনি পল্লিগ্রামের ঘন প্রকৃতির মাঝে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আত্মবিসর্জন দিয়েছেন। 'পথের পাঁচালী (১৯২৯) শিল্পসার্থক উপন্যাস।

References

📖 ব্যতিক্রম — p. 244